বিডি আর্কাইভ

খড়ম পায়ে হেঁটে যায়!

লিখেছেন আবু রেজা

হরম বিবি খড়ম পায়
খট্খটাইয়া হাঁইটা যায়
হাঁটতে গিয়া হরম বিবি
ধুম্মুড় কইরা আছাড় খায়
আছাড় খাইয়া হরম বিবি
ফিরা ফিরা পিছন চায় ….

খড়ম এক ধরনের পাদুকা। এই পাদুকা সাধারণত গৃহ পরিবেশে বা গৃহ-চৌহদ্দিতে পরা হয়। দূর-দূরান্তে ভ্রমণের জন্য এই পাদুকা ততটা উপযোগী নয়। পাদুকা হিসেবে খড়ম আবিষ্কার ও ব্যবহার দীর্ঘদিনের। সেই প্রাচীনকালে খড়মের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। সনাতন ধর্ম মতে, দেবতার তুষ্টির জন্য পাদুকা পূজার প্রচলন আছে। আর এ পূজায় ব্যবহার করা হয় খড়ম। কাউকে শাস্তি দেওয়া, শায়েস্তা করা বা চরম অপমান করার জন্য জুতাপেটা বা খড়মপেটা করা হতো। পায়ে দেওয়া, প্রহার করা থেকে শুরু করে পূজা পর্যন্ত নানা কাজে ব্যবহার হয় খড়ম। আর জীবন শেষে খড়মের স্থান হয় চুলোয়। এমন বিচিত্র কাজে খড়মের ব্যবহার সত্যিই চমকপ্রদ!

প্রথমে খড়মপেটা করার গল্প বলে শুরু করি। আমার নানাজি ছিলেন প্রকৃতই কৃষক। তার প্রতিদিনের জীবন বলে দেয়, জমি-চাষ, ফসল ফলানোই ছিল তার প্রথম ভালোবাসা। অবশ্যই প্রধান জীবিকাও বটে। নানাজি সারা দিন কাজ করে বিকেলে রইলা খড়ম পায়ে দিয়ে বাংলাঘরের সামনে পায়চারি করতেন। আর আমার ছোট মামা ছিলেন মহাদুষ্টু। প্রায়ই নাকি তিনি স্কুল ফাঁকি দিয়ে সিনেমা দেখেন Ñ নানাজির কাছে এই অভিযোগ এসেছে। একদিন দেখি, নানাজি পায়চারি করছেন। এমন সময় ছোট মামা এলেন। পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে। নানাজি হাতের কাছে কিছু না পেয়ে খড়ম দিয়েই ছোট মামাকে পিটানো শুরু করলেন। খড়ম-পেটা কি জিনিস সেদিন দেখেছিলাম। মামা সুযোগ বুঝে দৌড়ে পালালেন, নানা পিছন থেকে খড়ম ছুড়ে মারছেন। ভাগ্য ভালো খড়ম মামার মাথার উপর দিয়ে চলে গেল। যে ওজনদার খড়ম! মাথায় লাগলে মামার খবর ছিল। তারপর ছোট মামা দীর্ঘদিন লাপাত্তা।
আমাদের লোকজ জীবনের এমন অনেক উপকরণ আছে, যা আমাদের লোক-সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় রূপক বা উপমা হিসেবে এসেছে। লোক-সাহিত্যের একটি ধারা লোকজ ধাঁধা। লোকজ ধাঁধার মধ্যে অন্যান্য উপকরণের মতো স্থান করে নিয়েছে খড়ম। একটা লোকজ ধাঁধা বলি-

খাইন না, ছাইন না,
বোঝা ছাড়া চলইন না।

এটি বগুড়া অঞ্চলের একটি লোকজ ধাঁধা। পাঠক, নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে, এর অর্থ খড়ম। পাবনার চলন বিল অঞ্চলের একটি ধাঁধা এরকম-
চাম নাই, চামরী নাই, লোকে চড়ে ঘোরে
উবদা মুখে দুই শিং মস্তকের উপরে।

সম্ভবত এটি বইলা খড়মের কথা বলা হয়েছে। এতে মস্তকের উপর দুই শিং বলতে খড়মের বইলাকে বোঝানো হচ্ছে।

ভারতের মালদহ অঞ্চলের একটি ধাঁধা এরকম-

ফিঙে ফিঙে ফিঙে
তার কাঁকাল ফিনফিনে
ফিঙে যখন মনে করে,
গোটা মানুষ ঘারে করে।

পাঠক, নিশ্চয় বোঝা যাচ্ছে, এর অর্থও অবশ্যই খড়ম।

জুতা আবিষ্কার নামে রবীন্দ্রনাথের একটি সরস কবিতা আছে। কবিতাটি অংশ বিশেষ তুলে দেওয়া হলো :

কহিলা হবু, ‘শুন গো গোবুরায়
কালিকে আমি ভেবেছি সারা রাত্র,
মলিন ধুলা লাগিবে কেন পায়
ধরণী-মাঝে চরণ ফেলা মাত্র।
তোমরা শুধু বেতন লহ বাঁটি
রাজার কাজে কিছুই নাহি দৃষ্টি।
আমার মাটি লাগায় মোরে মাটি,
রাজ্যে মোর একি এ অনাসৃষ্টি!
শীঘ্র এর করিবে প্রতিকার
নহিলে কারো রক্ষা নাহি আর।’

রাজার চর ধাইল হেথা-হোথা,
ছুটিল সবে ছাড়িয়া সব কর্ম।
যোগ্যমত চামার নাহি কোথা,
না মিলে এত উচিতমত চর্ম।
তখন ধীরে চামার-কুলপতি
কহিল এসে ঈষৎ হেসে বৃদ্ধ,
‘বলিতে পারি করিলে অনুমতি
সহজে যাহে মানস হবে সিদ্ধ।
নিজের দুটি চরণ ঢাকো, তবে
ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে।’

কহিল রাজা, ‘এত কি হবে সিধে!
ভাবিয়া ম’ল সকল দেশসুদ্ধ।’
মন্ত্রী কহে, ‘বেটারে শূল বিঁধে
কারার মাঝে করিয়া রাখো রুদ্ধ।’
রাজার পদ চর্ম-আবরণে
ঢাকিল বুড়া বসিয়া পদোপ্রান্তে
মন্ত্রী কহে, ‘আমারো ছিল মনে
কেমনে বেটা পেরেছে সেটা জানতে।’
সেদিন হতে চলিল জুতা পরা-
বাঁচিল গোবু, রক্ষা পেল ধরা।।

পাদুকা বা খড়ম আবিষ্কারের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস জানা যায় নি। কিন্তু প্রাচীনকালেও যে পাদুকা ছিল তার নির্দশন আছে। এ পাদুকা কখনো খড়ম, কখনো জুতা কিংবা কখনো ছিল বুট জুতা আকৃতির। ধারণা করা হয়, প্রাচীন কালে আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পাদুকার ব্যবহার ছিল। প্রাচীন ভারতের শিল্পকর্মে জুতার নিদর্শন দেখা যায়।

সনাতন ধর্মে পাদুকা পূজার প্রচলন আছে। দুর্গাপূজার সময় পাদুকা পূজা করা হয়। রামায়ণে কথিত আছে, পিতার নির্দেশ পালনের জন্য রামচন্দ্রকে বনবাসে যেতে হয়। রামচন্দ্রের ভাই ভরত সিংহাসনের অধিকারী হন। ভরত হিংসাহনে না বসে ভাই রামচন্দ্রকে অনুরোধ করেন সিংহাসনে বসতে। কিন্তু রামচন্দ্র বনবাস ছেড়ে আসতে রাজী হন নি। ভরত রামচন্দ্রের পাদুকা বা খড়ম মাথায় করে সিংহাসনে স্থাপন করে চৌদ্দ বছর রাজ্য শাসন করেন। ধারণা করা হয়, এই পাদুকা ছিল সম্ভবত খড়ম শ্রেণীর। বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে পাদুকা শব্দের দুটি অর্থ দেওয়া আছে। প্রথমে লেখা আছে খড়ম, দ্বিতীয় অর্থ জুতা।

এছাড়াও অনেক প্রাচীন নির্দশনে জুতার ব্যবহার লক্ষ করা যায়। বাংলার প্রস্তর ভাস্কর্যে জুতার ব্যবহার আছে। প্রস্তর সূর্য মূতির্তে জুতার ব্যবহার দেখা যায়। কুষাণ যুগের প্রস্তর ক্ষোদিত সূর্য মূর্তিতে পায়ে বুট জুতা আছে। বুদ্ধের আদি প্রতীকের মধ্যে একটি হলো পাদুকা। পৌরাণিক অনেক শাস্ত্রে জুতা ব্যবহারের নানা রকম নিয়ম উল্লেখ আছে। জুতা ছিল অস্পৃশ্য। দেবতা ও গুরুজনকে জুতা খুলে প্রণামের নিয়ম ছিল। ব্রহ্মাচারী বহ্ম-আচার পালন বা পূজা অর্চনা করা অবস্থায় যে গ্রামে বাস করেন সে গ্রামে চলাচলের সময় জুতা ব্যবহার করা নিষেধ ছিল।

প্রাচীন শিল্প পরিচয় বিষয়ক একটি বইয়ে দুই ধরনের জুতার পরিচয় জানা যায়। যেমন-পাদুকা ও উপানৎ। পাদুকা দুই ধরনের। চটি পাদুকা ও খড়ম। আর উপানৎ হলো চর্মপাদুকা বা চামড়ার জুতা। এছাড়াও আরো এক ধরনের পাদুকার পরিচয় পাওয়া যায়, যার নাম গুরুপাদুকা। শাস্ত্রে গুরূপাদুকা তৈরির বিভিন্ন উপকরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শাস্ত্রমতে গুরু পাদুকা তৈরি করতে হবে চন্দন, দেবদারু কাঠ এবং সোনা, রূপা, মণি-রতœ সহযোগে। কাঠ দিয়ে তৈরি হতো বলে ধারণা করা হয় গুরূপাদুকা খড়ম শ্রেণীর। গুরুপাদুকা তৈরির উপকরণ ছিল চন্দনকাঠ, সোনা, রূপা, মূল্যবান মনি-রতœ বলে এ ধরনের খড়ম ছিল সাধারণ মানুষের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। তাই বলা যায়, প্রাচীনকালে খড়ম ব্যবহার করত অভিজাত শ্রেণী ও বিত্তশালী পরিবারের সদস্যরা।

আগেই বলেছি, প্রাচীনকাল থেকেই খড়মের প্রচলন আছে এ উপমহাদেশে। উনিশ শতক পর্যন্ত এদত অঞ্চলে খড়মের ব্যাপক ব্যবহার লক্ষ করা গেছে। উনিশ শতকে গ্রামের সকল মানুষের কাছে প্রিয় পাদুকা ছিল খড়ম। তখন নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র উভয়ই খড়ম ব্যবহার করত। গ্রামের বয়স্ক মানুষ, ধনী ও অভিজাত শ্রেণীর কাছে সাধারণ খড়মের চেয়ে বইলা খড়ম বেশি প্রিয় ছিল। সাধারণ খড়মের চেয়ে অভিজাত শ্রেণীর তৈারী বইলা খড়মে অনেক বেশি কারুকাজ এবং বিভিন্ন নকশা করা থাকত। বইলা খড়ম কাঠ, হাতির দাঁত, ধাতব উপাদান দিয়ে তৈরি হতো। আবার খোদাই করেও নকশা করা হতো। খড়মে ফুল, লতাপাতা জ্যামিতিক নকশার অলঙ্করণ থাকত। আর থাকত ধাতুর তার বা জালি ব্যবহার করে বিভিন্ন নকশা। আকৃতিগত দিক থেকেও নানান নকশা লক্ষ করা যায়। যেমন – মাছ আকৃতির খড়ম বেশ জনপ্রিয় ছিল বলে ধারণা করা হয়। আমাদের জাতীয় জাদুঘরে এরকম মাছ আকৃতির নকশার খড়ম এবং হাতির দাঁতের ও রূপার বইলা খড়ম সংগৃহীত আছে। এ ধরনের কারুকাজ যুক্ত খড়ম ছিল প্রাচীন ভারতের গুরু পাদুকার অনুরূপ। উনিশ শতকের পর বইলা খড়মের ব্যবহার কমে গেছে।

আরো একটু পরের কথা বলি। সময়টা ছিল বিশ শতকের শেষ ভাগ। এই সত্তরের দশক হবে। আমাদের ছেলেবেলা। সে সময় আমরা নারী-পুরুষ উভয়কে খড়ম পরতে দেখেছি। সাধারণত বাড়ির বয়স্ক ব্যক্তিরা বইলা খড়ম পরতেন। আর রাবার বা টায়ারের ফিতা দেওয়া চটি খড়ম পরতেন নারীরা। খড়ম পরে হাটা অতটা সহজ ছিল না। আমরা ছোটরা বড় বড় খড়ম পায়ে দিয়ে প্রায়ই হুমরি খেয়ে পড়তাম।

খড়ম তৈরি করা হয় হালকা কিন্তু মজবুত বা টেকসই কাঠ দিয়ে। তৈরির প্রক্রিয়া ও উপকরণ অনুসারে খড়ম দুই ধরনের। এক চটি খড়ম, দুই বইলা খড়ম। চটি খড়মে কাঠের পাটাতনের উপর টায়ার বা প্লাস্টিকের ফিতা দেওয়া থাকত, যা সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষ ব্যবহার করত। আর বেইলা খড়মে বুড়ো আঙুল ও এর পরের আঙুলের মাঝ বরাবর গোল মাথাওয়ালা কাঠের কাঠি বা বইলা বসানো থাকত। আর মহাজন, জমিদার বা সমাজের অভিজাত শ্রেণী ব্যবহার করত বইলা খড়ম। তাদের খড়মের খটখট শব্দে শুনে বোঝা যেত জমিদার বাবু হাঁটছেন।

এত কিছুর পরও কি খড়ম মহাশয়ের রেহাই আছে! মানুষ-বোঝা বইতে বইতে যখন ক্লান্ত, জীবন যখন নিভু নিভু তখন তার স্থান চুলোয়। ভাঙা অকেজো খড়ম ঝরাপাতা, খড়কুটো আর লাকড়ির সঙ্গে ঠেলে দেওয়া হয় চুলোয়। আগুনে পুড়ে ছাই হয় খড়ম। তারপর বিলীন হয়ে যায় নশ্বর খড়ম।
যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে খড়মের চেয়ে স্যান্ডেল ও জুতার ব্যবহার বেড়েছে। বর্তমানে খড়মের জায়গা দখল করে নিয়েছে রাবার বা প্লাস্টিকের স্যান্ডেল, চামড়ার স্যান্ডেল। খড়মের প্রচলন একেবারে নেই বললেই চলে। প্রচলন কমে যাওয়ায় এবং দক্ষ কারিগরের অভাবে খড়ম প্রায় বিলুপ্ত।

শুরু করেছিলাম একটি ছড়ার অংশ বিশেষ দিয়ে। এ ছড়াটি কোথায় শুনেছিলাম, কোথায় পেয়েছিলাম মনে নেই। স্মৃতি থেকে যতটুকু উদ্ধার করতে পেরেছি, তাই তুলে দিয়েছি। লেখাটির শেষ পর্যায়ে এক সহকর্মী দু’লাইন ছড়া দিলেন, সেটিং তুলে দিচ্ছি।

নরম বিবি খড়ম পা
হাঁটতে বিবি লড়ে গা।

তথ্যসূত্র ও কৃজ্ঞতা স্বীকার : ড. জিনাত মাহরুখ বানু ও রতন চক্রবর্ত্তী

আবু রেজা

মন্তব্য দিন