lorazepam on alcohol withdrawal amoxicillin 250mg cap can you buy generic cialis in the usa alprazolam high .5 ativan and benadryl side effects
বিডি আর্কাইভ

ধান ভানে ঢেঁকি

লিখেছেন আবু রেজা

ও ধান ভানিরে
ঢেঁকিতে পাড় দিয়া,
ঢেঁকি নাচে আমি নাচি
হেলিয়া দুলিয়া।।

জানি না কে গেয়েছিল এ গান। কিন্তু এখন আর ধান ভানতে এ গান গাওয়া হয় না। এ গান শোনা যায় রেডিও, টেলিভিশনে। হয়তো অনেক জায়গায় ঢেঁকিতে ধানই ভানা হয় না। ঢেঁকির বদলে এসেছে যান্ত্রব ছাটাই কল। তাতেই ধান থেকে চাল করা হয়। প্রায় উঠেই গেছে ঢেঁকির ব্যবহার।
অতি প্রাচীনকাল থেকে আবহমান বাংলার জনজীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল ঢেঁকি। ঢেঁকিতে ধান ভানা হতো। চিড়া কোটা হতো। পিঠা তৈরির জন্য গুঁড়ি কোটা হতো। ছাতু বানানো হতো ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে। এরকম আরো কিছু কাজে ব্যবহার হতো ঢেঁকি। আমাদের দেশ ছাড়াও ভারত, চীন, ইন্দোনেশিয়ায় ঢেঁকির প্রচলন আছে।

ঢেঁকি তৈরির জন্য দরকার শক্ত ধরনের প্রশস্ত গাছ। গাছ কেটে তা লম্বা সটান আকৃতি দেওয়া হয়। মাথার দিকটা হয় মোটা, পায়ের দিকটা থাকে চ্যাপ্টা। মাথার দিকে থাকে একটি শুঁড়। একে বলে মুষল। কেউ বলে চুরুন। একেক জায়গায় এর একেক নাম। মুষলের শেষ দিকে বসানো থাকে লোহার চাকতি। ঢেঁকি যেখানে বসানো হয় সেখানে ঢেঁকির মাথার দিকে একটি গর্ত করা হয়। এই গর্তকে বলা হয় নোট। গর্তে পাথর বা কাঠ খোদাই করে বসানো হয়। ঢেঁকির পেছনের দিকটা থাকে একটি ফ্রেমে আটকানো থাকে। এই ফ্রেমের পেছনে ঢেঁকির গোড়ায় চাপ দিলে মুষলসহ ঢেঁকির মাথা উপরে উঠে যায়। আবার ছেড়ে দিলে ঢেঁকির মাথা নিচে নেমে আসে। মুষল এসে সামনের গর্তে পড়ে।

ঢেঁকি ব্যবহারের বিশেষ পদ্ধতি আছে। ধান ভানার জন্য ঢেঁকির সামনের দিকে গর্তের মধ্যে ধান দিতে হয়। আর ঢেঁকির গোড়ার দিকে একজন বা দুইজন চাপ দেয়। এতে ঢেঁকির মাথা উপরে উঠে যায়। আবার ছেড়ে দিলে নিচে পড়ে ধানে আঘাত করে। আরেকজন নোটের কাছে বসে। ঢেঁকির আঘাতের ফাঁকে ফাঁকে সে ধান নাড়ায়। এভাবে ঢেঁকি দিয়ে ধান ভেনে চাল করা হয়। এই একই পদ্ধতিতে চিড়ে কোটা, গুঁড়ি কোটা, ছাতু বানানো হয়।

আবহমান বাংলার লোকজ জীবনে ঢেঁকি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লোকজ জীবনের সঙ্গে জড়িত প্রবাদ প্রবচনেও দেখা যায় ঢেঁকির ব্যবহার। বাংলা ভাষায় ঢেঁকি নিয়ে কিছু বাগধারাও প্রচলিত আছে। এসব প্রবাদ প্রবচন আর বাগধারায় ঢেঁকির গুরুত্ব উল্লেখযোগ্য। কিছু প্রবাদ প্রবচন, বাগধারা উল্লেখ করা যাক।
আমরা কাঠের ঢেঁকি – এর অর্থ হলো অকাজের লোক। আমরা কাঠের যেমন ঢেঁকি হয় না, তেমনি অকাজের লোক দিয়ে কোনো কাজ হয় না। বোকা লোককে বলে বুদ্ধির ঢেঁকি।

পরের ফোঁড়া ঢেঁকি দিয়ে গালে – এর অর্থ হলো সামান্য বিষয়ে অস্বাভাবিক বস্তুর ব্যবহার। এই যেমন মশা মারতে কামান দাগার মতো আর কি! যেমন ক্ষ্যাপা তেমনি ক্ষেপি/ তুলো পিঁজতে আনে ঢেঁকি। এর অর্থও অনেকটা আগেরটার মতোই। অর্থাৎ ছোট কাজের জন্য বিরাট আয়োজন।

ঢেঁকি দিয়ে কান বেঁধানো – এর অর্থও সামান্য কাজে বড় কিছুর ব্যবহার। লাথির ঢেঁকি/চড়ে উঠবে সেকি – এর অর্থ হলো যার জন্য যে ওষুধ দরকার। অর্থাত্ যার লাথি খেয়ে অভ্যাস, তার চড়-চাপ্পরে কিছু হয় না।

ঢেঁকি অবতার – এর অর্থ হলো নির্বোধ। যার বোধ শক্তির অভাব আছে তাকে বলা হয় ঢেঁকি অবতার। ঢেঁকি ভ’জে স্বর্গে যাওয়া – এর অর্থ হলো অসম্ভব। অর্থাত্ এ দিয়ে বোঝানো হচ্ছে ঢেঁকি ভ’জে স্বর্গ লাভ সম্ভব নয়।
ঢেঁকির তসুলি – এর অর্থ হলো যারা কখনো এ পক্ষে কখনো ও পক্ষে যায়। অর্থাত্ দুই দিকের মন রক্ষা করে চলার চেষ্টা করে তাদের বলে ঢেঁকির তসুলি।

ঢেঁকি কেন গাঁ বেড়াক না/গড়ে পড়লে হলো। এর অর্থ কাজ হওয়া দিয়ে কথা। অর্থাত্ যে যে কাজের জন্য, সে আর যাই করুক না কেন, আসল কাজ হলেই হলো। আসল কাজের জন্য তাকে পেলেই যথেষ্ট।
হেলায় গেল বেলা জ্যোত্স্নায় শুকাক ধান/ওঠ কলসী জলকে ঢল ঢেঁকি কুটবে ধান। এর অর্থ হলো অলস লোকেরা ভাবে অন্য লোকে সব করবে। আবার এর উল্টোটাও আছে। যেমন, ঢেঁকিশালে যদি মানিক পাই/ তবে কেন পর্বতে যাই। এর অর্থ হলো ঢেঁকি যদি চালের বদলে অর্থ দেয় তবে অর্থ আয়ের জন্য দূরদেশে যাওয়ার দরকার নেই।

ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে- এর অর্থ হলো মন্দ ভাগ্য। যার ভাগ্য মন্দ তার কোনো অবস্থাতেই ভালো কিছু জুটে না। একটু ভিন্নভাবেও চিন্তা করা যায়। যে যে কাজে লাগে সে যেখানে যাক, তাকে সে কাজই করতে হয়। বুকে ঢেঁকির পাড় পড়া – এর অর্থ কোনো শোক বা দুঃখের জন্য মনোযন্ত্রণা ভোগ করা। ঘরের ঢেঁকি কুমির – অর্থাত্ ঘরের লোকই শত্র“।

অবুঝে বোঝার কত, বুঝ নাহি মানে/ঢেঁকিরে বোঝাব কত নিত্য ভাড়া বানে। অর্থাত্ যে বোকা তাকে শত উপদেশ দিলেও একইভাবে চলে।

আড়াআড়ি পাড়া/মাঝের ঢেঁকিতে ভাড়া। অর্থাত্ প্রতি বাড়িতেই তো আর ঢেঁকি থাকে না। এক বাড়ির ঢেঁকিতে অন্য বাড়ির ধানও ভানা হয়। এক কথায় এতো কি/আহ্লাদের ঢেঁকি। এর অর্থ এক কথা ইনিয়ে-বিনিয়ে বারবার বলা।

কপালে না থাকলে দেখি/ঢাকটা পড়ে ভাঙে ঢেঁকি। অর্থাত্ ভাগ্য মন্দ হলে সামান্য দুর্ঘটনায় অনেক বড় ক্ষতি হয়। দক্ষিণে ঢেঁকি উত্তরে বেল/লক্ষ্মী বলে এই বাড়ি গেল্। অর্থাত্ গৃহস্থ বাড়ির দক্ষিণ দিকে ঢেঁকি এবং উত্তর দিকে বেল গাছ গৃহস্থের জন্য মঙ্গলজনক নয়।

নারদের ঢেঁকি – এর অর্থ হলো যারা মিথ্যা বলে ঝগড়া লাগায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরাণের কথা। নারদ মুনির বাহন ছিল ঢেঁকি। তিনি ঢেঁকিতে চড়ে স্বর্গ-মর্ত্যে ঘুরে বেড়াতেন। আর এক দেবতার সঙ্গে আরেক দেবতার ঝগড়া লাগাতেন।

এসব প্রবাদ প্রবচন আমরা বড়দের প্রায়ই বলতে শুনি। এও বলতে শুনি, ঢেঁকির ঢেক্ ঢেক্ আর ঢাকের বাদ্যি থামলেই ভালো। কিন্তু এখানেই একটু দ্বিমত আছে। ঢেঁকির ঢেক্ ঢেক্ শব্দ থেমে যাওয়া কি সত্যিই ভালো? এর উত্তরে না কিংবা হ্যাঁ না বলে একটু খতিয়ে দেখা যাক।
এখন উন্নতমানের ধানকল এসেছে। এতে ধান ছেঁটে চাল করা হয়। চাল গুঁড়ো করা যায় যান্ত্রব কলে। ঢেঁকির ব্যবহার অনেক কমে গেছে। এতে আমাদের লাভ, না কি ক্ষতি হয়েছে?

ঢেঁকির গুণের কথা একটু ভেবে দেখি। ঢেঁকিছাঁটা চালের ভাত, খিচুড়ি, জাও আর পোলাওয়ের কি সুবাস! ঢেঁকিছাঁটা চালের স্বাদই আলাদা। শুধু স্বাদের কথাই বলি কেন? ঢেঁকিছাঁটা চালা পাওয়া যায় না। ঢেঁকিতে কোটা চিড়ার স্বাদ পাব কোথায়? ঢেঁকিতে কোটা চালের গুঁড়ির পিঠা কি মজা! এই স্বাদ কলে ভাঙানো চালের পিঠায় পাব কীভাবে?

আর ঢেঁকি কিন্তু পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না। ঢেঁকিতে ধান ভানতে জ্বালানি লাগে না। এতো কিছুর পরও কি আমরা চাইব ঢেঁকির আওয়াজ থেমে থাক। এভাবে ঢেঁকির আওয়াজ থেমে গেলে আগামীতে আমাদের ঢেঁকি দেখতে হবে জাদুঘরে গিয়ে।
প্রবাদ প্রবচনে ঢেঁকিতে যতই অপবাদ দেওয়া হোক না কেন, আবহমান বাংলায় ঢেঁকি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে ছিল। এখনো যেখানে যান্ত্রব ধানকল পৌঁছেনি সেখানে ঢেঁকিই ধান ছাঁটার একমাত্র অবলম্বন। টিকে থাক ঢেঁকি, টিকে থাক আবহমান বাংলার ঐতিহ্য।

আবু রেজা

মন্তব্য দিন