phentermine and diabetes i take valium valium with benzos phentermine high dosage what is desloratadine 5mg tablets used for препараты содержащие силденафил sildenafil
বিডি আর্কাইভ

মিষ্টি মধুর খেজুর গুড়

লিখেছেন আবু রেজা

দাদা গো! দেখছি ভেবে অনেক দূর-
এই দুনিয়ার সকল ভাল,
আসল ভাল নকল ভাল,
সস্তা ভাল দামীও ভাল
তুমিও ভাল আমিও ভাল,
……………………….
……………………….
গিটকিরি গান শুনতে ভাল,
শিমুল তুলা ধুনতে ভাল,
ঠান্ডা জলে নাইতে ভাল,
কিন্তু সবার চাইতে ভাল,
পাউরুটি আর ঝোলা গুড়।
ছড়াকার সুকুমার রায় অনেক ভালর সন্ধান দিয়েছেন। কিন্তু সবার চাইতে ভালো বলেছেন, পাউরুটি আর ঝোলা গুড়। আসলে পাউরুটি আর ঝোলা গুড় যে না খেয়েছে, তাকে বোঝানো যাবে না পাউরুটি আর ঝোলা গুড়ের স্বাদ। এখন তো আর ঝোলা গুড় দিয়ে পাউরুটি খাওয়া হয় না। পাউরুটি খাওয়ার জন্য আছে জেলী। কিন্তু জেলীতে খেঁজুর রসের ঝোলা গুড়ের স্বাদ কীভাবে পাওয়া যাবে?
শীতের কুয়াশা ঢাকা সকাল। খুব ভোরে ছেলেপুলেরা ঘুম থেকে উঠেছে। হাতমুখ ধুয়ে খড়কুটোয় আগুন জ্বেলে হাত-পা তাপাচ্ছে। অপেক্ষা করছে কখন রোদ তেতে উঠবে। তখন রোদ পোহাবে। অপেক্ষার আরো একটি কারণ আছে। তা হলো খেঁজুর রস। কখন রস আসবে সে আশায় বসে আছে।
খুব ভোরে গাছ থেকে রসের হাড়ি নামিয়ে আনা হয়। ভোর বেলার হিমশীতল রস খাওয়ার স্বাদই আলাদা। ভোর বেলায় রস খেলে শীত আরো জাঁকিয়ে বসে। শীতে শরীর কাঁপতে থাকে। শীত লাগে লাগুক না। তবুও রস খাওয়ার বিরাম নেই। এক গ্লাস, দুই গ্লাস খাওয়ার পর কাঁপতে কাঁপতে আরো এক গ্লাস মুখে তুলে রোদ পোহানো। কেউ আবার রসের সঙ্গে মুড়িও নিয়েছে। রোদ পোহাচ্ছে আর গ্লাসে চুমুক দিচ্ছে।
রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হবে গুড়। গুড়ের আবার রকমফের আছে। যেমন- পাটালি গুড়, ঝোলা গুড়। এসব গুড় আবার বিভিন্নভাবে খাওয়া হয়। গুড় দিয়ে পিঠা তৈরি হয়। শীতে খেঁজুর গুড়ের ভাপাপিঠা – আহ্ কী স্বাদ! খেজুর গুড়ের পুলিপিঠা, দুধের পিঠা, সেম পিঠা – আরো কত কি! পাটালি গুড় দিয়ে মুড়ি, ঝোলা গুড় দিয়ে মুড়ি অনেকেরই প্রিয় খাবার। অনেকে তো গুড় এমনি এমনিই খায়। খেজুর রস দিয়ে তৈরি রসেরপিঠা খুব সুস্বাদু। খেজুর গুড়ের সন্দেশের স্বাদ অপূর্ব। অনেকে শখ করে খেজুর গুড়ের চাও খায়।
রস পেতে হলে খেজুর গাছ বিশেষ কায়দায় কাটতে হয়। যারা গাছ কাটে তাদের বলা হয় গাছি। গাছিদের গাছ কাটার জন্য কয়েকটি উপকরণ দরকার হয়। যেমন-দা, দা রাখার জন্য একটি ঝাঁপি, দড়ি এবং এক টুকরো চামড়া বা পুরনো বস্তা। গাছি যে ঝাঁপি ব্যবহার করে তা বাঁশ দিয়ে তৈরি। গাছে উঠার সময় গাছি এই ঝাঁপিতে দা রাখে। কোমরে বেঁধে নেয় চামড়া বা বস্তা। গাছ কাটার সময় শরীরের ভারসাম্য রক্ষার জন্য গাছি কোমর বরাবর গাছের সঙ্গে দড়ি বেঁধে নেয়। দড়িটা বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। এই দড়ির দুই মাথায় বিশেষ কায়দায় গিট দেওয়া থাকে। গাছে উঠার সময় গাছি অতি সহজে মুহূর্তের মধ্যে গিঁট দুটি জুড়ে দিয়ে নিজের জন্য গাছে উঠার নিরাপদ ব্যবস্থা করে নেয়।
গাছ কাটার জন্য গাছের মাথার এক দিকের শাখা কেটে চেঁছে পরিষ্কার করা হয়। কাটা অংশের নিচের দিকে দুটি খাঁজ কাটা হয়। খাঁজ থেকে কয়েক ইঞ্চি নিচে একটি সরু পথ বের করা হয়। এই সরু পথের নিচে বাঁশের তৈরি নলী বসানো হয়। এই নলী বেয়ে হাড়িতে রস পড়ে। নলীর পাশে বাঁশের তৈরি খিল বসানো হয়। এই খিলে মাটির হাড়ি টাঙিয়ে রাখা হয়। এই হাড়িতে রস জমা হয়।
একবার গাছ কাটার পর দুই তিন দিন রস পাওয়া যায়। প্রথম দিনের রসকে বলে জিরান কাট। জিরান কাট রস খুবই সুস্বাদু। প্রথম দিনের রস থেকে ভালো পাটালি গুড় তৈরি হয়। দ্বিতীয় দিনের রসকে বলে দোকাট। তৃতীয় দিনের রসকে বলে তেকাট। রসের জন্য গাছ একবার কাটার পর পাঁচ ছয় দিন পর আবার কাটা হয়। গাছের কাটা অংশ শুকানোর জন্য এসময় দেওয়া হয়। কাটা অংশ শুকানোর সুবিধার জন্যই সাধারণত পূর্ব ও পশ্চিম দিকে গাছ কাটা হয়। যাতে সূর্যের আলো সরাসরি কাটা অংশে পড়ে।
গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য মাটির হাড়ি ব্যবহার করা হয়। এই হাড়িকে বলে ভাঁড়। কোথাও বলে ঠিলা। ভাঁড় দেখতে অনেকটা ছোট আকৃতির কলসের মতো। মাঝারি আকৃতির দশ থেকে পনেরো ভাঁড় রস জ্বাল দিলে এক ভাঁড় গুড় হয়। এই এক ভাঁড় গুড়ের ওজন হয় ছয় থেকে আট কেজির মতো।
গুড় তৈরির জন্য রস জ্বাল দেওয়া হয় মাটির জালায় বা টিনের তাপালে। খুব সকালে রস নামিয়ে এনেই জ্বালানো হয়। জ্বাল দিতে দিতে এক সময় রস ঘন হয়ে গুড় হয়ে যায়। এ গুড়ের কিছু অংশ তাপালের এক পাশে নিয়ে বিশেষভাবে তৈরি একটি খেজুর ডাল দিয়ে ঘষতে হয়। ঘষতে ঘষতে এই অংশটুকু শক্ত হয়ে যায়। এই শক্ত অংশকে বীজ বলে। বীজের সঙ্গে তাপালের বাকি গুড় মিশিয়ে দেওয়া হয়। স্বল্পক্ষণের মধ্যে গুড় জমাট বাঁধতে শুরু করে। তখন এই গুড় মাটির হাঁড়ি বা বিভিন্ন আকৃতির পাত্রে রাখা হয়। গুড় জমাট বেঁধে পাত্রের আকৃতি ধারণ করে।
খেজুর গাছ ছয় সাত বছর বয়স থেকে রস দেওয়া শুরু করে। পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছর পর্যন্ত রস দেয়। গাছ পুরনো হয়ে গেলে রস কমে যায়। পুরনো গাছের রস খুব মিষ্টি হয়। মাঝ বয়সী গাছ থেকে সবচেয়ে বেশি রস পাওয়া যায়। বেশি রস সংগ্রহ করা গাছের জন্য ক্ষতিকর।
রস সংগ্রহের জন্য কার্তিক মাসে খেজুর গাছ কাটা শুরু হয়। কার্তিক মাস থেকেই রস পাওয়া যায়। রসের ধারা চলতে থাকে ফাল্গুন মাস পর্যন্ত। শীতের সঙ্গে রস ঝরার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। শীত যত বেশি পড়বে তত বেশি রস ঝরবে। রসের স্বাদও তত মিষ্টি হবে। অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ মাস হলো রসের ভর মৌসুম।
খেজুর গাছ শুধু রস দিয়েই ক্ষান্ত হয় না। খেজুর পাতা দিয়ে পাটি তৈরি হয়। খেজুর পাতা দিয়ে এক ধরনের সাহেবী টুপিও তৈরি হয়। খেজুর পাতা, ডাল এবং গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। গ্রামে মোরুব্বা তৈরিতেও খেজুর কাটার ব্যবহার আছে।
সারা বাংলাদেশেই খেজুর গাছ আছে। তবে বৃহত্তর খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল এবং যশোর জেলায় প্রচুর খেজুর গাছ জন্মে। এর মধ্যে যশোরের খেজুর রস আর খেজুর গুড়ই বিশেষভাবে খ্যাত। এক সময় যশোরের খেজুর থেকে চিনিও তৈরি হতো। যশোরের খেজুর গুড় থেকে এখনো স্বল্প পরিমাণে চিনি তৈরি হয়। কথায় বলে, যশোরের যশ খেজুরের রস।

আবু রেজা

মন্তব্য দিন