বিডি আর্কাইভ

শীতল পাটিতে আসন পাতি

লিখেছেন আবু রেজা

একটি শিশুর জন্ম হলো। পরিবারে যুক্ত হলো একজন নতুন সদস্য। নতুন সদস্যের জন্যে ছোট ছোট কাঁথা বালিশ তৈরি হয়েছে। কেনা হয়েছে একটি ছোট শীতল পাটিও। শীতল পাটিতে বিছানা করে শোয়ানো হবে শিশুটিকে। শিশুটি একটু বড় হলে এ পাটিতে বসেই খেলবে।
গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। নানা রকম সাজ সজ্জার সমাহার। কিন্তু একটি নকশা করা শীতল পাটি ছাড়া অনুষ্ঠানই হবে না। নকশা করা শীতল পাটিতে কনে বসবে। তাকে ঘিরে বসবে সখীরা। তারপর শুরু হবে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান। অন্যদিকে বরের গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানেও নকশা করা পাটি চাই।
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস। আম-কাঁঠালের মওসুম। জামাই আসবে শ্বশুড় বাড়ি বেড়াতে। জামাইয়ের জন্য কিনে রাখা হয় একটি শীতল পাটি। জামাই এই কাঁঠালপাকা গরমে শীতল পাটিতে শুয়ে গা জুড়াবে।

গাঁয়ে রাতে বসে পুঁথি পাঠের আসর। গল্পের আসর। যিনি পুঁথি পাঠ করেন, গল্প বলেন তিনি একটু উঁচু টুলে বসেন। দর্শক শ্রেতাদের পাটি পেতে দেওয়া হয়।
এসব ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক উত্সব আয়োজনে পাটির ব্যবহার আছে। দৈনন্দিন পারিবারিক জীবনেও পাটির ব্যবহার হয়। বিছানায় চাদরের পরিবর্তে শীতল পাটি বিছানো হয়।

এরকম আরো কত কাজেই তো পাটির ব্যবহার রয়েছে। তবে উল্লেখ করার মতো আরেকটি বিষয় হলো শিল্পকর্মে পাটির ব্যবহার। ইদানিং শিল্পীরা বিভিন্ন শিল্পকর্মে পাটি ব্যবহার করছেন। অনেক শিল্পীই বইয়ের প্রচ্ছদ করছেন পাটির নকশা দিয়ে। হস্তশিল্পে পাটি ব্যবহার করে বিভিন্ন জিনিসপত্র তৈরি হচ্ছে। যেমন- পাটি দিয়ে তৈরি হচ্ছে হ্যান্ডব্যাগ, ভেনিটিব্যাগ, মানিব্যাগ, কলমদানি, ফটোস্ট্যান্ড ইত্যাদি।

পাটি আছে বিভিন্ন রকমের। যেমন-শীতল পাটি, বুকা পাটি, মাদুর, চাটাই ইত্যাদি। এসব পাটির উপকরণ ও তৈরির কৌশল আলাদা।
শীতল পাটি তৈরি হয় পাটিবেত দিয়ে। এই পাটিবেত দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে পরিচিত। কোথাও এটি মুর্ত্তাবেত। কোথাও এর নাম মোত্রাবেত। কোথাও একে বলে পাটিবেত। কোথাও বলে পাটিতা। যেখানে যে নামেই পরিচিত হোক না কেন শীতল পাটি বোনার জন্য এ গাছের শক্ত মসৃণ ছাল ব্যবহার করা হয়।

পাটিবেত গাছ দেখতে সবুজ লাঠির মতো। এ গাছ প্রায় সাড়ে চার ফুট লম্বা হয়। গাছের ব্যস প্রায় এক ইঞ্চি। এ গাছ সরল এককাণ্ড বিশিষ্ট। গাছের মাথায় কিছু শাখা-প্রশাখায় এক ধরনের ছোট ছোট ফুল হয়। ফুলের রঙ ধবধবে সাদা। ছায়ায় এ গাছ ভালো হয়।
শীতল পাটি তৈরির জন্য পাটিবেত গাছের ছাল ব্যবহার করা হয়। গাছ থেকে ছাল ছাড়ানোর জন্য ধারালো দা ব্যবহার করা হয়। দা দিয়ে গাছকে কয়েক ফালিতে ফাঁড়া হয়। গাছের বাকল থেকে ভিতরের নরম সাদা অংশ দা দিয়ে চেঁছে আলাদা করা হয়। এভাবে গাছ থেকে ছাল সংগ্রহ করা হয়। ছালকে বলা হয় বেতী। বেতী মসৃণ করার জন্য ভাতের ফেনের সঙ্গে টক মিশিয়ে সিদ্ধ করা হয়।

বেত গাছের ভিতরের সাদা অংশ দিয়ে তৈরি হয় বুকা পাটি। আর বাইরে মসৃণ ছাল বা বেতী দিয়ে তৈরি হয় শীতল পাটি। বুনন শিল্পীরা বেতী আড়াআড়িভাবে বুনে পাটি তৈরি করেন। পাটি বুননের দুইটি দিক আছে, যেমন- খাড়া ও আড়া। একটিকে বলে তানা, অপরদিকে বানা। বুনন শিল্পীরা তানা ও বানায় বিভিন্ন রঙের বেতী দিয়ে নানান নকশা তৈরি করেন। ঘর, বাড়ি, জীবজন্তু, গাছ, পাতা, ফুল ইত্যাদি নকশা পাটিতে আঁকা হয়। কখনো আবার দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য জিনিসপত্রের ছবিও পাটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়।
শীতল পাটির উত্কর্ষতা বিচার করা হয় দুইভাবে। প্রথমত: পাটি কতটা মসৃণ। দ্বিতীয়ত: পাটি কতটা নকশাদার। মসৃণ শীতল পাটি খুবই কদর পায়। এর দামও বেশি। আবার নকশাদার পাটির দাম ও কদর দুইই বেশি। কাজেই শীতল পাটির মধ্যে যে পাটি যত মসৃণ ও নকশাদার তার কদর তত বেশি।
আমাদের দেশে বিভিন্ন জায়গায় শীতল পাটি বোনা হয়। সব জায়গার পাটির কদর সমান নয়। সিলেটের বালাগঞ্জের শীতল পাটি খুবই নাম করেছে। ফরিদপুরের বোয়ালমারির সাতুর ইউনিয়নের পাটিতা পাড়ার পাটিও সিলেটের পাটির মতো নামকরা। মোহনগঞ্জের জৈনপুরেও সিলেটের মতো মসৃণ পাটি তৈরি হয়। সিরাজদিখানের পাটি গড়পাড়া ও আশপাশের এলাকায় শীতল পাটি বোনা হয়। টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার থানার এলাসিন ইউনিয়নের বিন্নরী পাইত্যাপাড়া গ্রামে এবং এর আশপাশের এলাকায় ভালো শীতল পাটি তৈরি হয়। যশোরেও তৈরী হয় ভালো মানের শীতল পাটি। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জায়গায় শীতল পাটি তৈরি হয়।

এক সময় শীতল পাটির কদর ছিল। শীতল পাটির সঙ্গে সামাজিক মর্যাদার বিষয়টি জড়িয়ে ছিল। এখন আর শীতল পাটির ব্যবহার তেমন একটা নেই। পাটি বুনন শিল্পীরাও অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়েছে। এখন শীতল পাটি প্রায় বিলুপ্তির পথে।

আবু রেজা

মন্তব্য দিন