xithrone azithromycin 500mg side effects from metronidazole 400mg metronidazole for dogs to buy uk prescription contact lenses uk coloured quetiapine 200 mg street value
বিডি আর্কাইভ

হাত পাখার বাতাসে

লিখেছেন আবু রেজা

এক সময় আমাদের দেশে বিদ্যুত্ ছিল না। বৈদ্যুতিক পাখার তো প্রশ্নই আসে না। তখন আমাদের দেশের মানুষে গরমে বাতাস করত কী দিয়ে? হাত পাখা ছাড়া তখন আর কোনো উপায় ছিল না। বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ কিংবা ভাদ্র মাসের প্রচণ্ড গরমে হাত পাখাই ছিল একমাত্র সম্বল। মানুষ হাত পাখা নেড়ে নেড়ে বাতাস করে গা জুড়াত।
এই হাত পাখা নিয়ে লেখা একটি গান এ রকম —
তোমার হাত পাখার বাতাসে
প্রাণ জুড়িয়ে আসে,
কিছু সময় আরও তুমি
থাক আমার পাশে।।

এরও আগের কথা বলি। তখন রাজা-বাদশাহদের শাসন আমল। রাজা-বাদশাহরা যখন দরবারে আসীন হতেন, বিশাল আকৃতির হাত পাখা দিয়ে তাঁদের বাতাস করা হতো। রাজা-বাদশাহরা বসতেন সিংহাসনে। সিংহাসনের একটু পিছন দিকে দুইপাশে দুইজন পাখাওয়ালা বসত। দরবার যতক্ষণ চলত পাখাওয়ালার পাখা করাও ততোক্ষণ চলত। অনেক জমিদার কিংবা ধনাঢ্য পরিবারেও পাখা করার জন্য লোক রাখা হতো।

হাত পাখা ছাড়াও আরেক ধরনের পাখা ছিল। এই পাখা কাপড়ের তৈরি। মাথার উপর সিলিংয়ে ঝুলানো থাকত মোটা কাপড়। এর চারদিকে মোড়ানো থাকত লালসালু। এর সঙ্গে যুক্ত থাকত দড়ি। দূরে বসে একজন দড়ি ধরে টানত। দড়ির টানে লালসালু যুক্ত মোটা কাপড় এদিক-ওদিক নড়াচড়া করতো। এতে সারা ঘরময় বাতাস খেলে যেত।

এক সময় অফিস-আদালতে মাথার উপর সিলিংয়ে ঝুলানো এ ধরনের পাখা টেনে বাতাস করার রেওয়াজ ছিল। বেশি দিন আগের কথা নয়। এই ইংরেজ আমলে এমন কি ইংরেজ আমলের পরেও এ উপমহাদেশে জজ-ম্যাজিষ্ট্রেটের আদালতে এ ধরনের পাখা টেনে বাতাস করার ব্যবস্থা ছিল। তখন এ কাজের জন্য সরকারি কর্মচারীও নিযুক্ত ছিল।

এক সময় অতিথিদের বিশাল আকৃতির পাখা দিয়ে বাতাস করার রেওয়াজ ছিল। সে সময় বিয়ের আসরে পাখা করা হতো। বরকে পাখা করার জন্য পাখাওয়ালা বরপক্ষ থেকে বকশিস আদায় করত। তখন নতুন জামাইয়ের ব্যবহারের জন্য তৈরি হতো নকশাদার হাত পাখা।
হাত পাখার ব্যবহার শুরু হয়েছিল কবে থেকে? সেই অতি প্রাচীনকাল থেকেই হাত পাখার ব্যবহার শুরু হয়। তখনকার পাখা হয়ত এত নকশা করা ছিল না। পাখার সৌন্দর্যের প্রতিও হয়ত এতটা মনোযোগ ছিল না। শুরুতে হয়ত সুপারির খোল, গাছের বাকল, গাছের বড় পাতা ব্যবহার করত বাতাস করার জন্য। কালক্রমে গাছের পাতা, বাকল, সুপারির খোলের সঙ্গে হাতল সংযুক্ত করল। এতে পাখা সুবিধাজনকভাবে ব্যবহার উপযোগী হলো। এভাবেই সুদূর অতীতে তৈরি হয়েছিল হাত পাখা।

তারপর মানুষ মনোযোগ দিল পাখার সৌন্দর্য বৃদ্ধির প্রতি। বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করে তৈরি করত বিচিত্র সব পাখা। পাখার মধ্যে চিত্র এঁকে তৈরি করল নকশাদার পাখা। পাখার মধ্যে ফুটিয়ে তুলল গাছ, ফুল, লতা,পাতা। এমন কি বিভিন্ন রতম প্রাণীও স্থান করে নিল পাখার চিত্রকর্মে।
হাত পাখা বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন নামে পরিচিত। কোথাও বলে পাঙ্খা। কোথাও পাহা, কোথাও বলে বিচইন। নকশা অনুসারে পাখা আবার বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন-কাঁকইরজালা, গুয়াপাতা, সিলিংপোষ, সজনেফুল, শঙ্খলতা, সাগরদিঘি, মনসুন্দর, বাঘাবন্দী, মনবাহার, কাঞ্চনমালা, মানবিলাসী, ছিটাফুল, তারাফুল ইত্যাদি। একেক রকম নকশাদার পাখার একেক নাম।

বিভিন্ন রকম পাখার বিভিন্ন উপাদান। যেমন-তালাপাতা, নারকেলপাতা, খেজুরপাতা, বেত, সুপারির খোল, কলার খোল, শন, শোলা, কাশ, পাখির পালক, গমের ডাঁটা, মোটা কাগজ, বাঁশ, চুলের ফিতা ইত্যাদি। এসব উপাদান ব্যবহার করে বিভিন্ন রকম পাখা তৈরি হয়।
বাঁশ, বেত, কলার খোল দিয়ে পাটি বোনা হয়। এসব উপাদান দিয়ে পাটি বোনার কায়দায় পাখা তৈরি হয়। এসব পাখায় ফুল, পাতা, পাখি ইত্যাদি বিভিন্ন নকশা আঁকা হয়। বুননের কায়দায় পাখায় এসব নকশা ফুটে উঠে। এর সঙ্গে হাতল সংযুক্ত করলে তা পাখার রূপ পায়।
বাঁশের চটা দিয়ে চাকা তৈরি হয়। এই চাকায় টান টান করে কাপড় লাগানো হয়। কাপড়ের উপর এমব্রয়ডারি করে ফুল, পাতা, পাখি ইত্যাদি আঁকা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত করা হয় হাতল। বাঁশের চাকায় কাপড় লাগিয়ে তাতে ক্রুশের কাজ করেও নকশাদার পাখা তৈরি হয়। এই ধরনের পাখায় রঙিন কাপড়ের ঝালর লাগানো হয়।

তালপাতা সুতায় বেঁধে এক ধরনের পাখা তৈরি হয়। এই পাখা আবার গুটানো যায়। এতে সুবিধা হলো, ভ্রমণের সময় এই পাখা গুটিয়ে ব্যাগে ভরে নেওয়া যায়। এতে ভ্রমণের সময় হাতের কাছে পাওয়া পাখার বাতাসে স্বস্তি পাওয়া যায়। এই পাখায় রঙ দিয়ে নানা রকম নকশা আঁকা হয়।
বাঁশ দিয়ে আরেক ধরনের পাখা তৈরি হয়। রঙিন সুতায় বাঁশের শলা পেঁচিয়ে পাখার জমিন তৈরি হয়। বাঁশের শলায় পেঁচানো রঙিন সুতার মাধ্যমে বিভিন্ন নকশার আকৃতি ফুটে উঠে। এই পাখায় হাতল ও ঝালর লাগিয়ে পাখার রূপ দেওয়া হয়।
শোলা দিয়েও এক ধরনের পাখা তৈরি হয়। শোলার পাত যুক্ত করে গোলাকার পাখা তৈরি হয়। তাতে নানান নকশা আঁকা হয়।

বাঁশের শলা, গমের ডাটা বুনেও এক ধরনের পাখা তৈরি করা হয়। আবার এসব উপাদান রঙিন সুতায় সুই দিয়ে আড়াআড়িবাবে বেঁধে পাখা তৈরি হয়। বাঁধের রঙিন সুতা বিভিন্ন ধরনের নকশা তৈরি করে। এর সঙ্গে ঝালর লাগানো হয়।
তালপাতা দিয়েও এক ধরনের পাখা তৈরি হয়। এই পাখায় আলাদা করে হাতল লাগানোর দরকার হয় না। পাতার সঙ্গে যুক্ত ডাঁটাই হাতল হিসেবে কাজ করে। তবে তালপাতার পাখার উপর বাঁশের শলা দিয়ে তাতে তালপাতা মুড়িয়ে বেঁধে দেওয়া হয়।
সব ধরনের পাখাই নকশা করা হয়। নকশাই পাখাকে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করেছে। এক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছে নারী। বলা যায়, নারীর হাতেই হাত পাখা শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে।

বিদ্যুতের যুগে হাত পাখা এখন বিলুপ্তির পথে। গ্রামে-গঞ্জেও চলে গেছে পল্লী বিদ্যুত্। বিদ্যুতের শক্তিতে বৈদ্যুতিক পাখা ঘুরছে। হাত পাখা বিলুপ্তির দিন গুনছে। পেশাদার পাখা শিল্পীরা অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়ছে। তার উপর আবার মেশিনের তৈরি প্লাস্টিকের পাখা বাজারে এসেছে। এই পাখাও হাতে তৈরি হাত পাখাকে হুমকির সম্মুখীন করে দিয়েছে। তবে লোডশেডিং হলে হাত পাখার খোঁজ পড়ে বৈকি!

মন্তব্য দিন