বিডি আর্কাইভ

অযত্নে ঐতিহ্যের রাজশ্মশান মঠ

ভাওয়াল রাজবাড়ি শ্মশান মঠ। গাজীপুরের একটি ঐতিহ্যের নাম। ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে সাধারণত নির্মাণকালসহ বিভিন্ন তথ্যসংবলিত ফলক থাকে। কিন্তু এখানে নেই। আছে শুধু প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড। এতে নির্মাণের সময়কালও লেখা নেই।
স্থাপনাটির বয়সের বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় কেউ সঠিক তথ্য দিতে পারছেন না। কেউ বললেন, শত বছর। কেউবা বলেন, দুই শ বছর। একজন মুচকি হেসে বললেন, ‘জন্মের পর থেকেই দেখছি। বাপ-দাদার আমলেও ছিল। কিন্তু বয়স কত জানি না।’

যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী তৃপ্তি দত্ত। বাড়ি চট্টগ্রামে। আত্মীয়ের বাসা গাজীপুরে। বাবা ভাওয়াল রাজার গল্প বলতেন। আগ্রহটা সেখান থেকেই। গল্পে শোনা রাজার শেষ স্মৃতিগুলো দেখবেন। সম্প্রতি এক দুপুরে চলে এলেন রাজবাড়ি শ্মশান মঠ দেখতে। মঠ ঘুরে তিনে বলেন, মঠের বর্তমান অবস্থা দুঃখজনক। আশপাশে বস্তি। সামনে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ। ভেতরে ঢুকতেই ভয় লাগে।

ভাওয়াল রাজবাড়ি শ্মশান মঠ। সম্প্রতি তোলা ছবি। প্রথমআলো

দেখা যায়, সামনের তিনটি মঠের নির্মাণশৈলী সাধারণ। দেখতে একই রকম। বাকি পাঁচটি মঠ সুন্দর। এদের একটি সবচেয়ে উঁচু। মঠগুলোর দরজা-জানালা ভাঙা। কোনো কোনোটির স্মৃতিচিহ্নও মুছে গেছে। মঠের সামনের খোলা অংশে কিশোর-তরুণেরা খেলাধুলা করছে। ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। কেউ কেউ মঠের দেয়ালে কাপড় শুকাচ্ছে। মঠের ভেতরে ঢুকতেই নাকে দুর্গন্ধ আসে।
স্থানীয় বাসিন্দা বাবু সুশান্ত সরকার বলেন, ‘৩৮ বছর ভাওয়াল রাজশ্মশান বিলুপ্ত অবস্থায় ছিল। শ্মশান মঠ-মন্দির পরিচালনা ও সংরক্ষণ কমিটি এর দেখভাল করে। ভাওয়াল রাজশ্মশানের ১৭ বিঘা জায়গা। ব্যবহার হচ্ছে মাত্র ৪-৫ বিঘা। বাকি জায়গা অনেকে সরকারের কাছ থেকে লিজ (ইজারা) নিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মানুষ ঘুরতে এসে হতাশ হয়। ভালো পরিবেশ নেই। নিরাপত্তা তো দূরের কথা একটি সীমানাপ্রাচীরও নেই। আমরা শ্মশানে দুটো পূজা করি। একটি শিব, অন্যটি শ্মশান কালীপূজা।’
শ্মশান মঠের সামনে বস্তিঘর। কোনোটি পাকা, কোনোটি টিনশেড। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ভাড়াটে বলেন, ‘আমরা এখানে থাকছি অনেক দিন। ১৫০০ টাকা থেকে শুরুœকরে ৫ হাজার টাকায় বাসা ভাড়া পাওয়া যায়।’
ঘুরতে পছন্দ করেন হেদায়াতুল কবির। বিভিন্ন ঐতিহাসিক জায়গা ঘুরেছেন। এবার দেখার পালা ভাওয়াল রাজশ্মশান মঠ। ঘোরাঘুরি শেষে কবির বলেন, ‘মঠের ভেতরে খড়কুটো। বাতাসে দুর্গন্ধ। মঠের দেয়ালে বাসাবাড়ির কাপড়। পুকুরঘাট নেই। শবদাহ করার চিতাও দেখছি না। মনে হচ্ছে এটি ধ্বংসের পথে।’
শ্মশান মঠের পাশেই পুকুর। ময়লা-আবর্জনা পড়ে সয়লাব। পুকুরঘাট ছিল। সংস্কার হয়নি। ভেঙে গেছে। মঠের পূর্ব দিকে শবদাহ করার চিতা। অযত্ন-অবহেলায় এটাও বিলুপ্তপ্রায়। চিতার পূর্ব দিকে চিনাই নদ। এখন দেখে আর মনে হয় না যে, এটা নদী।
যোগাযোগ করলে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক দেওয়ান মুহাম্মদ হ‌ুমায়ূন কবীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব। আমরা ইতিমধ্যে পুরো ভাওয়াল রাজশ্মশান মঠটি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ আরম্ভ করেছি। মাপজোখ করে সীমানা নির্ধারণ হয়েছে। ভাওয়াল রাজশ্মশান মঠের ৪ একর জায়গা। পুরো এলাকা সীমানাপ্রাচীরের মধ্যে আনব। পাশ দিয়ে বয়ে চলা চিনাই নদের ৩ একর জায়গা। মোট ৭ একর জায়গা রক্ষার কাজ হাতে নিয়েছি। নতুন করে কাউকে জায়গা লিজ দেওয়া হবে না। যেসব জায়গা লিজ দেওয়া আছে তা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি। আশা করছি, শিগগিরই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি সংরক্ষণ করতে পারব।’

সূত্র: https://www.prothomalo.com/bangladesh/article/1415896/অযত্নে-ঐতিহ্যের-রাজশ্মশান-মঠ

মন্তব্য দিন