wellbutrin 150 mg xl vs sr doxycycline hyclate 100mg capsules for uti 2mg lorazepam and weed is a xanax bar 1 mg allegra 180 mg 24 hour
বিডি আর্কাইভ

অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ – নিজের লেখা শেষ বইটি দেখা হলো না তাঁর

প্রকৃত বহুগুণের মানুষ ছিলেন অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ। চাইলেই অনেক বিশেষণ লেখা যায় তাঁর নামের আগে। নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনেতা, শিক্ষাবিদ বা লেখক। যখন যেটা করেছেন, মমতা দিয়ে, নিষ্ঠার সঙ্গে করেছেন। সফলও হয়েছেন। হয়েছেন অনুসরণীয়।

মমতাজউদদীন আহমদ
নিজের মধ্যে যখন যেমন তাগিদ পেয়েছি, তেমনভাবেই লিখেছি নাটক—বলেছিলেন মমতাজউদদীন আহমদ

অর্ধশতাধিক বইয়ের লেখক। সর্বশেষ গত শনিবার প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা নতুন গ্রন্থ ‘আমার প্রিয় শেক্‌সপিয়ার’। বিশ্বসাহিত্য ভবনের প্রকাশক তোফাজ্জল হোসেন অ্যাপোলো হাসপাতালে নতুন বইটি নিয়ে গেলেন, তখন আর সেটি ধরে দেখার শক্তি নেই তাঁর। পরদিন গতকাল রোববার দুপুরে সবকিছুরই ঊর্ধ্বে চলে গেলেন মমতাজউদদীন আহমদ।

মন খারাপ করা শেষ দিনগুলো

রোগে–শোকে ভুগছিলেন দীর্ঘদিন। কারণটা মূলত বয়স। হুইলচেয়ারে অন্যের সাহায্যে চলতে–ফিরতে হতো। এ নিয়েই শেষ জীবনটায় মন খারাপ হতো সারা জীবন নিয়ম মেনে চলা, সোজাসাপ্টা কথা বলা মানুষটির। শেষ জন্মদিনে সেই হতাশার কথা বলেছিলেন। সেদিন ১৮ জানুয়ারি, ২০১৯। বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ৮৫তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘প্রচণ্ড হতাশ হয়ে গিয়েছি। চিন্তা করতে পারি না, পড়তে পারি না, ভাবতেও পারি না। ঘরভর্তি বই, স্পর্শ করতে পারি না। ৪৪ বছরের নিয়ম—ডায়েরিটাও লিখতে পারি না এখন। এমনকি নিজের হাতে খেতেও পারি না। শিশুর মতো হয়ে গেছি আমি। আমার বাঁচার কোনো যোগ্যতা নেই, আমি আবর্জনা মাত্র।’ এরপর ছেলে তিতাসের উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে ছেড়ে দাও, আমি চলে যাই। তোমার মা কষ্ট পাচ্ছে। এই মহিলাকে জীবনে কখনো শান্তি দিতে পারিনি।’ অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে স্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘যেতে দাও কুমু, আমার সময় হয়ে গেছে।’ মিলনায়তনের উপস্থিত অনেক মানুষ সেদিন অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন। প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে সেদিন আরও বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণা আমার। মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মঠ—সব আমার। পৃথিবীর সেরা দেশ আমার দেশ।’

মঞ্চকে অস্ত্র করে মমতাজউদদীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ করেছেন
মঞ্চকে অস্ত্র করে মমতাজউদদীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ করেছেন

ভালোবাসতেন দেশকে

দেশের প্রতি দারুণ ভালোবাসা ছিল তাঁর, যা বারবার প্রকাশ পেয়েছে তার কথায়, কাজে। মানুষের মনের গভীরে লুকানো আনন্দ-বেদনা, প্রেম, ভালোবাসা আর রসবোধকে ফুটিয়ে তুলতেন সহজ–সরল ভাষায়, তার লেখা গল্প–উপন্যাসে, টিভি, রেডিও ও মঞ্চনাটকে। বিশ্ব সাহিত্য ভবন থেকে প্রকাশিত ‘চেনা অচেনা নিউইয়র্ক’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, ‘মাতৃভূমি ছেড়ে ভিনদেশে ভিন মানুষের মাঝে বাস করা যে কত দুর্মর, যাঁদের অভিজ্ঞতা নেই, তাঁরা বুঝতে পারবেন না। মাতৃভূমির বিশেষ করে বাংলার ঘাস ও কুয়াশার সোঁদা গন্ধ আর টাটকা মাছের স্বাদ যে কত মধুময়, তা আমি বুঝি। আমার চারদিকে মানুষ। ডাইনে–বাঁয়ে, সামনে–পেছনে মানুষ আর মানুষ। কিন্তু কেউ আমার আপন নয়। আমি ওদের চিনি না, ওরাও আমাকে জানে না। ওদের ভাষা, আচার-আচরণ আমার অজানা, আমিও ওদের অজানা। আমার জ্যেষ্ঠপুত্র বলে, “এখানে সব পাবেন, কিন্তু মন পাবেন না।” মন যে কত বড় সম্পদ, তা–ই বুঝেছি হাড়ে হাড়ে।’

যেভাবে শুরু, যেভাবে পথচলা

১৯৩৫ সালের ১৮ জানুয়ারি ভারতের মালদাহ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। একজীবনে বারবার ক্রান্তিকাল দেখেছেন মমতাজউদদীন আহমদ। দেখেছেন নানা শাসনকাল। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। রাজশাহীর তুখোড় ছাত্রনেতা ও ভাষাসৈনিক গোলাম আরিফ টিপুর (বাংলাদেশের প্রথিতযশা আইনজীবী) সান্নিধ্যে ছাত্র রাজনীতিতে ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতেই রাজশাহী সরকারি কলেজের মুসলিম হোস্টেলের গেটে ইট ও কাদা দিয়ে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছিল। অনেকেই এটিকে দেশের প্রথম শহীদ মিনার বলে দাবি করে থাকেন। এ শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আইনজীবী গোলাম আরিফ টিপু, অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ, মেসবাহুল হক বাচ্চু, প্রকৌশলী মজিবুর রহমান প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি পূর্বাহ্ণেই অবশ্য পুলিশ এ শহীদ মিনার ভেঙে ফেলে। মাতৃভাষা আন্দোলন, মুক্তিসংগ্রামে সংযুক্ত হওয়া এবং রাজনীতি করার কারণে তিনি ১৯৫৪, ৫৫, ৫৬ এবং ৫৮ সালে গ্রেপ্তার হন।

পেশা ছিল শিক্ষকতা

শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল তাঁর। মমতাজউদদীন আহমদ ২৯ বছর বয়সে ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে চট্টগ্রাম কলেজে বাংলা বিভাগে যোগ দেন। বাংলা বিভাগের একতারা–সংবলিত লোগোটির পরিকল্পনাকারী অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ। এক স্মৃতিচারণে তিনি লিখেছেন, ‘চট্টগ্রাম কলেজ আমাকে সে নির্ভয় পথ চলার সন্ধান দিয়েছে। তারই সূত্র ধরে মধ্যাহ্ন সূর্যের আলো থেকে অপরাহ্ণের রঙিন অস্তরাগে চলেছি আমি। আমার মতো পাওয়া আর কার হবে।’

মমতাজউদদীন আহমদ, ২ জুন চলে গেলেন না ফেরার দেশে
মমতাজউদদীন আহমদ, ২ জুন চলে গেলেন না ফেরার দেশে

মুক্তিযুদ্ধ ও মঞ্চ

’৭১–এর মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্‌–প্রস্তুতির তিনি যোদ্ধা ও বোদ্ধা ছিলেন। ‘আকাশকে শামিয়ানা করে, লালদিঘির মাঠ বা প্যারেড ফিল্ডকে মঞ্চ করে আমরা নাটক করেছি’—স্মৃতিচারণে এভাবেই বলেছিলেন তিনি। স্বাধীনতার আগে থেকে তিনি নাট্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি মাঠে তাঁর রচিত ও নির্দেশিত ‘এবারের সংগ্রাম’ এবং ২৪ মার্চ চট্টগ্রাম চকবাজার প্যারেড ময়দানে ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’ নাটক দুটি পরিবেশিত হয়।

মঞ্চকে অস্ত্র করে মমতাজউদদীন আহমদ মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। স্বাধীনতার পরে তরুণ সেই সব সহযোদ্ধাদের নিয়ে তিনি থিয়েটার ’৭৩ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৩ সালে তাঁর রচনায় ও নির্দেশনায় চট্টগ্রাম ক্লাবে প্রথম মঞ্চস্থ হয় ‘স্পার্টাকাস–বিষয়ক জটিলতা’। মমতাজ–শিষ্যরা পরে গঠন করেন ‘অরিন্দম’। ১৯৭৪ সালে ২৫ নভেম্বর থিয়েটার ’৭৩ প্রযোজনায় তাঁর রচনায় ও নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হয় ‘হরিণ চিতা চিল’, আমেরিকান সেন্টার মিলনায়তনে। একই বছর তাঁর রচনায় ও নির্দেশনায় থিয়েটার ’৭৩–এর প্রযোজনায় মঞ্চস্থ হয় ‘ফলাফল নিম্নচাপ’। ১৯৭৫ সালে তিনি নির্দেশনা দেন মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’। ১৯৭৮ সালে তিনি দুটি নাটক রূপান্তর করেন; একটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস অবলম্বনে ‘দুই বোন’, অপরটি আন্তন চেখভের নাটক অবলম্বনে ‘যামিনীর শেষ সংলাপ’। ‘দুই বোন’ থিয়েটার ’৭৩-এর প্রযোজনায় আবদুল্লাহ আল মামুনের নির্দেশনায় মঞ্চ হয়। ‘যামিনীর শেষ সংলাপ’ অরিন্দম নাট্য সম্প্রদায় সদরুল পাশার নির্দেশনায় মঞ্চস্থ করে। তাঁর রচনায় ও নির্দেশনায় ১৯৮৯ সালে মঞ্চস্থ ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’ দারুণ সাড়া ফেলে। দীর্ঘদিন নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। ওই সময়ে স্বৈরাচারবিরোধী সাহসী নাটক ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’ সম্পর্কে বেগম সুফিয়া কামাল বলেছেন, ‘থিয়েটার অভিনীত মমতাজউদদীনের “সাতঘাটের কানাকড়ি” নাটক দেখলাম। বাংলা মায়ের আর্তকান্না শুনলাম। আরও দেখলাম সমাজের পরগাছা, দেশ ও জাতির মূর্ত লোভী ভণ্ডের ভণ্ডামি। সে মুখোশ খুলে দিতে সাহসী সংগ্রামী সত্যনিষ্ঠ বাংলার সন্তানদের শপথভরা মুখ।’ ড. নীলিমা ইব্রাহিম বলেছেন, ‘যে এক বুক আশা নিয়ে মানবাধিকারের দায়িত্বে ৭১–এ বাঙালিরা রক্ত দিয়েছে, তা আজ হতাশায় নিমজ্জিত। “সাতঘাটের কানাকড়ি” আমাদের পূর্বজীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জুগিয়েছে। মমতাজউদদীন আহমদ ও থিয়েটার কর্মীদের আলোর ইশারা জ্বলন্ত মশালে জাগরিত হোক, এই আমার কামনা এবং বিশ্বাস।’ আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘এ নাটক অনন্য, অসামান্য। জীবনের সঙ্গে বুদ্ধির, সাহসের সঙ্গে শক্তির, অঙ্গীকারের সঙ্গে উদ্যোগের ও আয়োজনের এমন সমাবেশ সমাজে, রাজনীতিতে দুষ্টু, দুর্জন, দুর্বৃত্ত, দুষ্কৃতির এমন বাস্তব সামষ্টিক সামাজিক চালচিত্র একাধারে ও যুগপৎ আর কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। ধন্য নাট্যকার, ধন্য অভিনেতারা ও প্রযোজক। আমি মুগ্ধ ও কৃতজ্ঞ দেখে ও শুনে।’

অর্ধশতাধিক বইয়ের লেখক মমতাজউদদীন আহমদ
অর্ধশতাধিক বইয়ের লেখক মমতাজউদদীন আহমদ

নাটক নিয়ে তাঁর ভাবনা

নাটক লেখা প্রসঙ্গে মমতাজউদদীন আহমদ একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘নিজের মধ্যে যখন যেমন তাগিদ পেয়েছি, তেমন ভাবেই লিখেছি নাটক। কারও সঙ্গে কারও বিরোধ হয়নি। শ্রেণিবিন্যাস করতে গিয়ে দেখলাম, আমার মধ্যে সুখ–দুঃখ, হাসি–কান্না, জ্বালা আর পরিহাস পাশাপাশি বাস করে। কথাটা হলফ করে বলতে পারি, নাট্য রচনা, প্রযোজনা এবং উপস্থাপনায় আমি কখনোই কপটাচার, মিথ্যাচার অথবা আপসকামিতাকে প্রশ্রয় দিইনি। কখনো দেবও না।’
মোট কতটি নাটক তিনি লিখে গেছেন, সেই হিসাব জানা সম্ভব হয়নি। সংখ্যাটা অনেক বড়। ‘বিবাহ’, ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, ‘বর্ণচোরা’, ‘এই সেই কণ্ঠস্বর’, ‘কী চাহ শঙ্খচিল’, ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’, ‘রাজা অনুস্বরের পালা’, ‘স্পার্টাকাস–বিষয়ক জটিলতা’, ‘হরিণ চিতা চিল’, ‘ফলাফল নিম্নচাপ’, ‘যামিনীর শেষ সংলাপ’, ‘এ রোদ এ বৃষ্টি’, ‘বুড়িগঙ্গার সিলভার জুবিলি’, ‘হৃদয়ঘটিত ব্যাপার–স্যাপার’, ‘আমাদের মন্টু মিয়া’, ‘ইদানীং শুভ বিবাহ’, ‘একটি কালো সুটকেস’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘দ্বৈরথ’, ‘দ্বন্দ্ব’, ‘দ্বিধা’, ‘দহন’, ‘ক্ষতবিক্ষত’, ‘হাস্য লাস্য ভাষ্য’, ‘পুত্র আমার পুত্র’, ‘বকুলপুরের স্বাধীনতা’, ‘সুখী মানুষ’, ‘রাজার পালা’, ‘বাউল বাঁশির সুর’, ‘তরুকে নিয়ে নাটক’, ‘ইন্টারভিউ আব্দুল যায়’, ‘গার্জেন’, ‘কথা হয়েছিল’, ‘ওষুধ’, ‘ধাঁধা’, ‘ফকির’, ‘গণনা’, ‘ফাস্ট’, ‘নগদ’, ‘শ্বশুরের পরীক্ষা’, ‘রাজকার্য’, ‘চিনি গো তোমায় চিনি’, ‘আমার বিবাহ বাসনা’, ‘ডিম্ব কাব্য’, ‘দম্পতি’, ‘ঘুঘু’, ‘সেয়ানে সেয়ানে’, ‘কেস’, ‘ভোট রঙ্গ’, ‘উল্টো পুরাণ’, ‘চড়’, ‘ভেবে দেখা’, ‘প্রশ্ন-উত্তর’, ‘অদ্ভুত রোগী’, ‘তিলকে তাল’, ‘যৌতুক সমাচার’, ‘কোকিল’, ‘ছহি বড় বাদশাহী কাব্য’—এর বাইরেও আরও নাটক আছে বলে মনে করেন অনেকে।

টেলিভিশন নাটকে

অনেকের মতে, বিটিভির ইতিহাসে মমতাজউদদীন আহমদ রচিত ও মোস্তফা কামাল সৈয়দ প্রযোজিত প্রতিটি নাটক মাইলফলক হয়ে থাকবে। বিশেষ করে রোমান্টিক নাটকে মমতাজউদ্দিন আহমদের সুখ্যাতি ছিল। কিছু না বলেও কীভাবে চোখের অভিব্যক্তি দিয়ে ভালোবাসা প্রকাশ করা যায়, তা তিনি দারুণভাবে বিটিভির নাটকগুলোতে দেখিয়েছেন। সুবর্ণা-আফজালকে নিয়ে পাঁচটা নাটক লিখেছেন তিনি, প্রতিটি সাড়া ফেলেছিল। নামগুলোও তেমনি, থোকা থোকা ফুলের মতো—‘এই সেই কণ্ঠস্বর’, ‘নিলয় না জানি’, ‘কুল নাই কিনার নাই’, ‘বন্ধু আমার’ এবং সর্বশেষ ‘নীরবে নিঃশব্দে’। খোলামেলা হাস্যরসের মাধ্যমে কত জটিল আর গভীর বিষয়গুলো তুলে আনতেন!

চলচ্চিত্রে

১৯৮০ সালে বাদল রহমান পরিচালিত ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’তে একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় দিয়ে তাঁর চলচ্চিত্রে অভিষেক। তারপর বেশ কিছু ছবির জন্য চিত্রনাট্য এবং সংলাপ রচনা করে সফলতা অর্জন করেন। যেমন, ‘লাল সবুজের পালা’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘নদীর নাম মধুমতি’, ‘চিত্রা নদীর পাড়ে’, ‘হাসন রাজা’, ‘শাস্তি’, ‘সুভা’ ইত্যাদি।

মমতাজউদদীন আহমদ ও স্ত্রী কামরুননেসা বেগম। ছবি: ফেসবুক থেকে
মমতাজউদদীন আহমদ ও স্ত্রী কামরুননেসা বেগম। ছবি: ফেসবুক থেকে

খুতখুঁতে মানুষটি

নিজের কাজ নিয়ে বরাবরই আন্তরিক এবং মানের ব্যাপারে ছিলেন খুঁতখুতে। পরিবারের প্রতিও দারুণ যত্নশীল। ছেলে তিতাস মাহমুদের একটি লেখা পড়ে বিষয়টি জানলাম। তিতাস লিখেছেন, ‘টেলিভিশনে বাবার নাটক চলাকালীন বাড়িতে পিনপতন নিস্তব্ধতা নিশ্চিত করা হতো। ক্রিং ক্রিং শব্দে যদি ফোন বাজত, সঙ্গে সঙ্গে রিসিভার তুলে ঠাস করে রেখে দিয়ে লাইন কেটে দেওয়া হতো। মাগরিবের নামাজের পরপরই মা আমাদের খাইয়ে দিয়ে যাবতীয় কাচের প্লেট, চামচ কিংবা ধোয়ামোছার কাজ সেরে ফেলতেন। নাটকের মাঝে একটু যে বিজ্ঞাপন বিরতি হতো, তখনো বাথরুম–টাতরুম যাওয়া নিষেধ ছিল। আমরা আগেভাগেই এসব প্রস্তুতি নিয়ে বসতাম। আসলে নাটক লেখা থেকে শুরু করে শিল্পী নির্বাচন, আবহ সংগীত, রিহার্সাল, শুটিং পর্যন্ত প্রতিটি বিষয়ে বাবা ছিলেন অসম্ভব অসম্ভব পারফেকশনিস্ট। এরপরে টেলিভিশনে নাটকটি প্রচারের সময় তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রতিটি দৃশ্য দেখতেন। তার এই একাগ্র ধ্যানে বিন্দুমাত্র ব্যাঘাত ঘটানোর দুঃসাহস আমাদের ছিল না। নাটক শেষ হলেই টেলিফোনের পর টেলিফোন আসত। চারিদিক থেকে তাঁর গুণগ্রাহীরা শুভেচ্ছা জানাতেন। কিন্তু তাঁদের কারও কথা বাবা খুব বেশি আমল দিতেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার মা (কামরুননেসা বেগম) নাটকটিকে ‘ভালো হয়েছে’ বলতেন।

বড় মাপের কথক

শুধুই যে তিনি বড় মাপের লেখক বা নাট্যজন ছিলেন, তা নয়, ছিলেন বড় মাপের কথক। যেকোনো আড্ডার মধ্যমণি হয়ে যেতেন। তাঁর বলার ভঙ্গি যেমন অনবদ্য, আর গল্পের বিষয় অত্যন্ত রসালো ও সরেস।
আর শোনা যাবে না তাঁর কথা, আড্ডায় তিনি মধ্যমণি হবেন না। সফেদ অনন্ত বাসে তিনি ৩ জুন সোমবার ফিরে যাচ্ছেন বাবার কাছে, হিমগাড়িতে। মাটির বিছানা হবে তাঁর শেষশয্যা। কিন্তু মৃত্যুকে জয় করার শক্তি মানুষের না থাকলেও কিছু কিছু মানুষের দেহান্তর মানেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া নয়। মমতাজউদদীন আহমদ তাঁদের সে তালিকায় পড়বেন, এ কথা বলাই যায়। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর সৃষ্টিতে। ফেলে যাওয়া স্বজনদের আড্ডার মধ্যমণি না হলেও তিনিই হবেন আড্ডার বিষয়।

মাসুম আলী, ঢাকা – প্রথম আলো

মন্তব্য দিন